[Book Review] অধ্যায়

#বই_পর্যালোচনা
বইয়ের নামঃ অধ্যায়
লেখকঃ তকিব তৌফিক
ধরণঃ উপন্যাস
প্রকাশনীঃ নালন্দা
প্রকাশকালঃ ২০১৯
মুদ্রিত মূল্যঃ ২৫০/-

কাহিনী সংক্ষেপঃ 
অবৈধ পথে কাঁচা পয়সা কামাতে ওস্তাদ গোফরান। পানের দোকানের আড়ালে যার রয়েছে মদের রমরমা ব্যবসা। সেই মদের দোকানে নানান কিসিমের লোকজন ভীড় জমায়। তাদেরই একজন আনসারী। প্রচারবিমূখ কবি। জগৎ সংসার সম্বন্ধে কবিরা সাধারণত যেমন হয় আর কি। টিউশনি করে দিব্যি চলে যায় তার। একদিন মাতলামো করতে গিয়ে অ্যাক্সিডেন্ট এর শিকার হয়ে হাসপাতালে গিয়ে অবচেতন মনে গেঁথে যায় এক নারী চিকিৎসকের মুখাবয়ব। সুস্থ হয়ে অপেক্ষায় থাকে আরেকবার তাকে দর্শনের।


আমির। আনসারীর বন্ধু। বোন পারুলকে সাথে নিয়ে একটি বাসায় থাকে। বাবা মা থাকেন দূরে। আনসারীকে বেজায় ভালোবাসে আমির। তবে পারুল যেন একটু দূরত্ব বজায় রাখে আনসারী থেকে। আমিরের জন্মদিনে আনসারীকে আমির জানায় কিছু গোপন সত্যের কথা। সব শুনে আনসারীর অবস্থা হয় খাঁচায় পোরা পাখির মতো। বুঝতে পারে সামনে বন্ধুর খুব বিপদ, ভয়াবহ বিপদ। আনসারীর মনের এহেন অবস্থার মধ্যেই দৃশ্যপটে আগমন ঘটে কনকের। আনসারীর অবচেতন মনের স্বপ্নভঙ্গকারিণী ডাক্তারের। পারুলের বান্ধবী জবার বোন। ডালপালা মেলে আনসারীর মন। সে জীবন সম্পর্কে সচেতন হতে চেষ্টা করে। মাঝেমাঝে দেখা হয় তাদের। এরই ধারাবাহিকতায় হাসপাতালের গেটম্যানের সহায়তায় কনককে চিঠি পাঠায় আনসারী। কিন্তু চিঠি পেয়ে জটিল হয়ে যায় পরিস্থিতি। এদিকে ছাত্র দিব্যর বাবা সোমনাথের একটি অদ্ভুত আবদারে রাজি হয়ে আমির, পারুল, কনক কাউকে না জানিয়ে ১৫ দিনের জন্য সোমনাথের ব্যবসায়িক প্রতিনিধি হিসেবে আমেরিকা গমন করে আনসারী। উদ্দেশ্য নিজের জীবনকে আরেকটু গুছিয়ে নিয়ে কনকের সামনে হাজির হওয়া। পেছনে মন সায়রে ঝড় তুলে রেখে যায় কনককে, প্রাণপ্রিয় বন্ধু এবং বন্ধুর বোন পারুল কে। ভাবে, মাত্র ১৫ দিনই তো। কিছুই হবে না। কিন্তু জীবনসমগ্রের অধ্যায় বড়ই বিচিত্র। ভাবনার চেয়েও যা অনেক রূঢ়।

#পাঠ_প্রতিক্রিয়া
লেখকের পড়া দ্বিতীয় বই এটি। এর আগে তাঁর ‘এপিলেপটিক হায়দার’ পড়েছিলাম। প্রথম বই পড়ার পর লেখকের প্রতি যতটুকু চাহিদা তৈরি হয়েছিল, ‘অধ্যায়’ পড়ে তার খুব কমই তিনি মেটাতে পেরেছেন বলে মনে হলো। এটি সম্ভবত তিনি প্রথাগত ধারার বাইরে নিজস্ব একটি ধরণ সৃষ্টির প্রচেষ্টার কারণে।
প্রথমত, লেখক তার লেখায় এক একটি বিষয়ের বিশদ বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখায় মেদ টেনেছেন বেশ। বিষয়টি অনেক পাঠকের জন্য সমস্যার মনে হতে পারে। অতিরিক্ত রূপকের ব্যবহার যেমন করে লেখার গতিকে বেশ নামিয়ে দিয়েছে, আবার একই বাক্যকে ভিন্নরূপে উপস্থাপনার কারণে বাক্যের সৌন্দর্য হারিয়েছে অনেকবার। কাহিনীতে সর্বনামের ব্যবহার বেশ কম ছিল। বরং বিশেষ্যের ব্যবহার বাক্যকে দুর্বল করে দিয়েছে বহুলাংশে।
দ্বিতীয়ত, কবিতার ব্যবহার। যদিও লেখক বইয়ের শুরুতে অদক্ষ হাতে গড়া কবিতা বলে মার্জনা চেয়ে নিয়েছেন কিন্তু পাঠক সেসব কবিতা পড়েছে আনসারীর কবিতা ভেবে। পুরো কাহিনীতে আনসারীকে যে মানের কবি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, কবিতায় প্রায়শই তার প্রতিফলন দেখা যায় নি। ফলে শুরু থেকে শেষ অবধি আনসারী চরিত্রটি বেশ দুর্বল লেগেছে। বরং কবিতা ব্যতিরেকে অন্য কোন ভাবে বিষয়টি টানা গেলে আনসারীর জায়গাটা আরো পোক্ত হত।


তৃতীয়ত, চিঠির ব্যবহার। লেখক যেসব চিঠি উপস্থাপন করেছেন সেসব চিঠিতে মূলত চিঠির মালিকের অন্তর্নিহিত ভাবাবেগটুকু ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। কিন্তু আবেগের প্রায়োগিক উপস্থাপনা তিনি করতে পারেননি। বরং অনেকক্ষেত্রেই চিঠি হয়ে গিয়েছে স্কুল-কলেজে সাহিত্যচর্চা করা আনকোড়া বালকের মতো।
চতুর্থত, কাহিনীর শুরুর দিককার পারুল আর শেষের দিককার পারুলের এমন রিভার্স আচরণ দেখে পারুলকে সুবিধাবাদী মেয়ে ভাবাটা পাঠকের পক্ষে সহজ। বরং শেষের আচরণের একটা আবহ যদি শুরুর দিকে রাখা যেত তাহলে চরিত্রটি আরো বাস্তব হতো।


পঞ্চমত, আনসারীর ‘সোমনাথ দ্য গ্রান্ড ফাদার’ উপন্যাস রচনা করাটা কিছুটা অবাস্তব নয় কি? যেখানে সোমনাথের জন্য আনসারীকে বেশ চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। তারচেয়ে বরং ছাত্র দিব্যকে দিয়ে সোমনাথ ও আনসারীর জীবনের গল্প নিয়ে কোন লেখা লেখাতে পারলে আরো যৌক্তিক হতো মনে করি। যেহেতু দিব্যও লেখালেখি প্র্যাকটিস করতো।


ষষ্ঠত, শুরুর দিকে প্রচুর সময় নিয়ে বর্ণনা করার কারণে শেষের দিকে তাড়াহুড়া পরিলক্ষিত হয়েছে বেশ। শুরুর দিকে আরেকটু গুছিয়ে নিলে শেষের দিকে লেখক আরো গুছিয়ে বর্ণনা করার সুযোগ পেতেন। তাছাড়া আমির পারুলের প্রসঙ্গ হঠাৎ হঠাৎ দৃশ্যপটে আসায় তাদের প্রতি পাঠকের ফোকাস বেশ কম থাকে বলে মনে হয়। যেহেতু আনসারীর মনের বিরাট একটা জায়গা জুড়ে আমির রয়েছে, সেহেতু মাঝে মাঝেই তার প্রসঙ্গটি আনা যেত।


সপ্তমত, গোফরানের পানের দোকানের আড়ালে মদের রমরমা ব্যবসা! পুরো ব্যাপারটিই কেমন অবাস্তব নয়? বরং কোন খাবার হোটেলের আড়ালে মদের ব্যবসা হলেও বিষয়টি গ্রহনযোগ্য হতো। সাধারণত পানের দোকান আমরা বড়জোড় টং দোকান হিসেবে দেখি। সেখানে আসলে দেয়াল দিয়ে মদের ব্যবসা করা যায় না। তাও মোটামুটি বার টাইপ মদের দোকান, যেখান থেকে পুলিশের পেটে নিয়মিত মাসোহারা যায়। তবে অন্ধকার জগতে অপরাধীর সাথে পুলিশের সম্পর্কটা কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় তার বয়াণ টা আসলেই চমৎকার ছিল।
অষ্টমত, পুরো কাহিনীতে সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যায়ণ হয়েছে কনক চরিত্রের। একজন ডাক্তার মেয়ের যেরকম ব্যক্তিত্ব, চিন্তাভাবনা থাকা উচিত তার প্রায় পুরোটাই কনকের মাঝে পাওয়া যায়। ব্যক্তিগতভাবে মাঝেমাঝেই আমার মনে হয়েছে, লেখকের কোন মেয়ে ডাক্তারের সাথে পরিচয়ের ঘনিষ্টতা আছে কি? হা হা হা। মজা করলাম। আরো ভালো লেগেছে মফিজ, খলিলুল্লাহ, গোফরান, জবার চরিত্রায়ণ। পল্লবীর জায়গাটা ধোঁয়াশা মতো মনে হলো শেষতক। এছাড়া শেষদিকে কাহিনীর টুইস্টটা আরো জোরালো করা যেতে পারতো। সচেতন পাঠক অবচেতন মনেই টুইস্ট ধারণা করে ফেলতে পারবে।


যবনিকাঃ কাহিনীর শেষভাগে গিয়ে লেখক যেভাবে পাঠকের অনুভূতিতে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছেন তাতে করে অনায়াসেই তাকে পাঠকের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় যে, শুরুর দিকে কেন এই অনুভূতিতে নাড়া দিতে পারেননি। বলা যেতে পারে এই বইয়ের শক্তিশালী অধ্যায়টিই হচ্ছে শেষের ২০%। জীবনের রূঢ় বাস্তবতার কাছে আমরা কতটা অসহায়, কনকের মহত্ত্ববোধ, ইত্যাদি খুঁটিনাটি ব্যাপার আগের ৮০% দুর্বলতার জায়গাটায় ভালোই প্রলেপ দিতে সক্ষম হয়েছে। এই ২০% জায়গাটি আসলে আমাদের সাধারণ মানুষের জীবনের একটি স্বাভাবিক রূপ। সেই সাথে এই জায়গাতেই বোঝা যায় লেখকের ক্ষমতা আছে পাঠককে আরো ভালো কিছু দেবার। এই পটেনশিয়াল ব্যাপারটা সবার থাকে না। লেখকের সেটা আছে। সেটাকে ধারণ করে অপেক্ষা সামনে এগিয়ে যাবার।
লেখকের ক্রমশ উন্নতি দেখবার অপেক্ষায় রইলাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here